দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের আধিপত্য বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্যমতে, মালয়েশিয়ায় কর্মরত মোট বিদেশি শ্রমশক্তির ৩৭ শতাংশই বাংলাদেশি নাগরিক। চলতি বছরের জুন মাসের শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় বৈধ কর্মসংস্থানের অনুমতি নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ৮ লাখ ৩ হাজার ৩৩২ জন, যা এই সংখ্যাকে অন্যান্য দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ স্থানে নিয়ে গেছে। এই পরিসংখ্যানটি কেবল সংখ্যার দিক থেকেই বিশাল নয়, বরং মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অপরিহার্য ভূমিকারও সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
এই গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান সোমবার (পার্লামেন্টে এক প্রশ্নের জবাবে) মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হয়। এই তথ্য মালয়েশিয়ার স্থানীয় সংবাদপত্র দ্য স্টার-এর এক বিশদ প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে স্বল্পদক্ষ শ্রমিক সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমানে সবচেয়ে বড় উৎস।
কোভিড-পরবর্তী শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ এবং নতুন কর্মীর আগমন
কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে বিশ্বব্যাপী শ্রমবাজার স্থবির হয়ে পড়লেও, ২০২২ সালে মালয়েশিয়া যখন পুনরায় বিদেশি কর্মীদের জন্য তাদের সীমান্ত উন্মুক্ত করে, তখন থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের আগমনের হার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। দেশটির অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং শ্রম ঘাটতি পূরণের জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী:
২০২২ সালে: শ্রমবাজার পুনরায় খোলার পর সেই বছরে ৪৯ হাজার ৩৫৩ জন নতুন বাংলাদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করেন। যদিও কোভিড-পরবর্তী বিধিনিষেধ ও প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে এই সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম ছিল, তবুও এটি নতুন করে কর্মসংস্থান শুরুর একটি সূচনা বিন্দু তৈরি করে।
২০২৩ সালে: বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত ও সহজ করার জন্য মালয়েশিয়া সরকার 'ফরেন ওয়ার্কার রিক্রুটমেন্ট রিল্যাক্সেশন প্ল্যান' (Foreign Worker Recruitment Relaxation Plan) নামে একটি অস্থায়ী নীতি প্রবর্তন করে। এই নীতি শিথিল করার ফলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের আগমন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ২০২৩ সালে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশাল সংখ্যক, প্রায় ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫৪৮ জন নতুন বাংলাদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করেন। এই পরিসংখ্যানটি নির্দেশ করে যে মালয়েশিয়ার নির্মাণ, উৎপাদন, প্ল্যান্টেশন (যেমন পাম অয়েল) এবং পরিষেবা খাতের মতো স্বল্পদক্ষ শ্রমিক নির্ভর শিল্পগুলিতে বাংলাদেশের কর্মীর চাহিদা কতটা তীব্র।
এই দ্রুত ও ব্যাপক হারে কর্মী আগমন প্রমাণ করে যে মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশি শ্রমিকরা এক নির্ভরযোগ্য এবং অপরিহার্য শ্রমশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছেন।
বৈধ কর্মসংস্থান ও শ্রম বাজারের গুরুত্ব
মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন দপ্তরের নথি অনুযায়ী, জুন মাস পর্যন্ত সময়ে ৮ লাখ ৩ হাজার ৩৩২ জন বাংলাদেশি শ্রমিক অস্থায়ী ওয়ার্ক পারমিট (PLKS) নিয়ে সক্রিয়ভাবে কর্মরত রয়েছেন। এই বিপুল সংখ্যক কর্মী মালয়েশিয়ার মোট বিদেশি শ্রমিকদের ৩৭ শতাংশ হওয়া এই বিষয়টিই নিশ্চিত করে। এই কর্মীরা মূলত স্বল্পদক্ষ খাতে নিয়োজিত থাকলেও, তারা দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষিজ পণ্য উৎপাদন এবং শিল্প কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের এই সংখ্যা কেবল দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে বাড়িয়ে তুলছে না, বরং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককেও শক্তিশালী করছে। প্রতিটি বৈধ কর্মী দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন, যা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে।
প্রত্যাবাসন এবং অবৈধ অভিবাসনের চিত্র
বৃহৎ পরিসরে কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি কিছু সংখ্যক শ্রমিকের দেশে ফেরত আসা বা অবৈধভাবে অবস্থান করার ঘটনাও ঘটেছে। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিষয়েও স্বচ্ছ তথ্য প্রদান করেছে:
প্রত্যাবাসন: মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিয়োগকর্তাদের দ্বারা দেশে ফিরিয়ে দেওয়া অস্থায়ী ওয়ার্ক পারমিটধারী বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ২০২২ সালে ছিল ২০ হাজার ৩৩১ জন এবং ২০২৩ সালে তা বেড়ে ২৩ হাজার ৬৫ জনে দাঁড়ায়। এই প্রত্যাবাসনের কারণগুলোর মধ্যে সাধারণত চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া, অপ্রত্যাশিতভাবে চাকরি হারানো, বা নিয়োগকর্তা ও কর্মীর মধ্যে সৃষ্ট জটিলতা অন্যতম।
অবৈধ অভিবাসী: ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অতিরিক্ত সময় অবস্থান করার কারণে আইনি জটিলতায় পড়া বাংলাদেশি নাগরিকের সংখ্যাও উল্লেখ করা হয়েছে। অবৈধভাবে অতিরিক্ত সময় অবস্থানের কারণে এখন পর্যন্ত ৭৯০ জন বাংলাদেশি নাগরিককে মালয়েশিয়ায় আটক করা হয়েছে। এই ধরনের ঘটনা শ্রমিকদের জন্য যেমন আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করে, তেমনি দেশের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সংখ্যাটি বৈধ শ্রমিকের সংখ্যার তুলনায় সামান্য হলেও, অবৈধ অভিবাসন রোধে এবং কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
মালয়েশিয়ায় ৮ লাখের বেশি বৈধ বাংলাদেশি শ্রমিকের উপস্থিতি এবং মোট বিদেশি শ্রমশক্তির ৩৭ শতাংশ দখল করা বাংলাদেশের জন্য এক বড় অর্জন। এটি একদিকে যেমন বাংলাদেশের বিশাল শ্রমশক্তির প্রমাণ, তেমনি অন্যদিকে মালয়েশিয়ার অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানকে তুলে ধরে। যদিও কোভিড-পরবর্তী দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়ার সময় কিছু সংখ্যক কর্মী প্রত্যাবর্তিত বা আটক হয়েছেন, তবুও সামগ্রিক চিত্রটি ইতিবাচক এবং মালয়েশিয়ায় স্বল্পদক্ষ শ্রমের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দুই দেশের সরকারের যৌথ উদ্যোগে কর্মীদের কর্মপরিবেশ উন্নত করা, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও নৈতিক ও স্বচ্ছ রাখা, এবং অবৈধ অভিবাসন রোধের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
© 2025 NRB. All Rights Reserved.